স্তন্য ক্যান্সার ও সচেতনতা

স্তন্য ক্যান্সার ও সচেতনতা

স্তন্য ক্যান্সার কি:শরীরের অন্যান্য স্থানের মত স্তনে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে কোন চাকা বা পিন্ডের সৃষ্টি হলে তাকে টিউমার বলে। শরীরের বিনা প্রয়োজনে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন থেকে এর সৃষ্টি। প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্তনের টিউমার দুই ধরণের।

১. বিনাইন টিউমার অক্ষিতিকার টিউমার। উত্পত্তি স্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দূরের বা কাছের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে না।

 

২. ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আগ্রাসী, ক্ষতিকারক টিউমার। উত্পত্তি স্থলের সীমানা ছাড়িয়ে আশেপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে কিংবা গ্রন্থিকে আক্রান্ত করে। এমনকি রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে দূরের কোন অঙ্গেও আঘাত হানতে পারে। স্তনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই স্তন্য ক্যান্সার

 

স্তন্য ক্যান্সার সাধারণত: স্তনের দুধবাহী নালীতে হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য টিস্যু থেকেও শুরু হতে পারে। একটি পিন্ড বা চাকা হিসেবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি প্রথম ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে বড় হয় এবং শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। স্তনের সঙ্গে নিকটস্থ বগলতলার লসিকাগ্রন্থি বা গ্ল্যান্ডগুলোর খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এগুলোতে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি।

 

স্তন্য ক্যান্সারের ব্যাপ্তি

 

ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে সারা বিশ্বে স্তন ক্যান্সারের স্থান দ্বিতীয়, শীর্ষে রয়েছে ফুসফুসের ক্যান্সার। আর মহিলাদের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুর কারণ হিসাবে স্তনের ক্যান্সারই রয়েছে শীর্ষস্থানে। বিশ্বের মহিলারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন স্তনের ক্যান্সারে। আক্রান্তের হার বছরে প্রতি এক লাখ মহিলার মধ্যে আশি জন। অনুমিত হিসেবে অনুযায়ী বিশ্বে ১০,৫০,০০০ এর বেশি মহিলা প্রতি বছর নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫,৮০,০০০ মহিলা উন্নত দেশগুলোর, বাকিরা আক্রান্ত হন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বাংলাদেশে মহিলাদের ক্যান্সার হিসেবে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের স্থান শীর্ষে, দ্বিতীয় স্থানে স্তন ক্যান্সার-এটাই বরাবরের ধারণা। তবে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার রেজিষ্ট্রি থেকে সাম্প্রতিক পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের স্থান শীর্ষে।

 

রিস্ক ফ্যাক্টরসমূহ অপরিপবর্তনযোগ্য ঝুঁকি-

জেন্ডার বা লিঙ্গ:পুরুষেরও স্তন্য ক্যান্সার হতে পারে। তবে মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একশগুণ বেশি।

বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্তন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত: পঞ্চাশের পর ঝুঁকি বেশি বাড়ে।

জেনেটিক: বিআরসিএ১, বিআরসিএ২ নামের জিনের মিউটেশন ৫% থেকে ১০% স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

বংশগত কারণ: কারোর পরিবারের কোন মহিলা যেমন-মা, খালা, বড় বোন বা মেয়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে।

মাসিক: যে সব মহিলার ১২ বছর বয়সের পূর্বে মাসিক শুরু এবং ৫০ বছর বয়সের পর মাসিক বন্ধ হয় তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

হরমোন: যারা দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন হরমোনের সংস্পর্শে থাকেন, মাসিক বন্ধ হওয়ার পরবর্তী মহিলা যারা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করেন, তাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া, এক স্তনে ক্যান্সার হয়ে থাকলে অন্যটিতেও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

পরিবর্তন যোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টর

সন্তান সংখ্যা- নিঃসন্তান মহিলাদের স্তন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে।

অধিক বয়সে সন্তান গ্রহণ- ৩০ বছর বয়সের পর বিয়ে ও প্রথম সন্তানের মা হওয়া স্তন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ব্রেস্টফিডিং- সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানোর অভ্যাস স্তন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

খাদ্যাভ্যাস- শাক-সবজি ও ফলমূল কম খেয়ে, চর্বি জাতীয় খাবার বেশি খেলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

ওজন- অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক পরিশ্রমের অনভ্যাস স্তন্য ক্যান্সারে ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে, তেজষ্ক্রিয়া বিকিরণ, স্তনে কোন সাধারণ চাকা বা পিন্ড থাকা ইত্যাদি।

 

স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ

  1. স্তন্যে চাকা বা পিন্ড

  2. স্তন্যের বোঁটা বা নিপল ভিতরে ঢুকে যাওয়া, অসমান বা বাঁকা হয়ে যাওয়া।

  3. স্তন্যের বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রস বা রক্তক্ষরণ হওয়া।

  4. চামড়ার রঙ বা চেহারায় পরিবর্তন

  5. বগলতলায় পিন্ড বা চাকা হওয়া।

 

প্রাথমিক অবস্থায় স্তন্য ক্যান্সার নির্ণয়

 

দুটি উপায়ে প্রাথমিক অবস্থায় স্তন্য ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব:

 

১. স্তন্য ক্যান্সারের কোন লক্ষণ দেখা দিলে জরুরীভাবে চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা।

 

২. যাদের লক্ষণ নেই, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে স্তন্য ক্যান্সারের রোগী সনাক্ত করা। স্তন্য ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর জন্য রয়েছে প্রধান তিনটি পদ্ধতি। যথা-ম্যামোগ্রাম, ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন ও ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন।

 

ম্যামোগ্রাম

 

ধনী দেশগুলোতে স্তন্য ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর জন্য প্রধানত ম্যামোগ্রাম বেছে নেয়া হয়। নির্ধারিত বয়স সীমার (সাধারণত: ৫০ বছরের বেশি) মহিলাদের নির্ধারিত বিরতিতে এক, দুই বা তিন বছর পরপর নিয়মিতভাবে ম্যামোগ্রাম করা হয়। এটি একটি বিশেষ ধরণের এক্সরে, যার মাধ্যমে স্তনে খুব ছোট চাকা বা অন্যান্য পরিবর্তন ধরা পড়ে। এই পদ্ধতি তুলনামুলকভাবে ব্যয়বহুল এবং খুব সহজলভ্য নয় বলে উন্নয়নশীল দেশে অন্য পদ্ধতিগুলোর উপর জোর দেয়া হয়।

 

ব্রেস্ট এক্সামিনেশন

 

চিকিত্সক অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী দিয়ে স্তন্য পরীক্ষা করে নেওয়া। চিকিত্সক স্তন এবং বগলতলায় কোন চাকা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন আছে কিনা তা সযত্নে পরীক্ষা করে দেখবেন।

 

ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন

 

একজন মহিলা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিজেই নিজের স্তন্য পরীক্ষা করবেন। মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে যদি নিয়মিতভাবে নিজের স্তন্য ভালোভাবে পরীক্ষা করেন তাহলে যে কোন ধরণের অসামাঞ্জস্য ও পরিবর্তন নিজেই প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করতে পারবেন।

 

সুতরাং ২০ বছর বয়স থেকে সারা জীবন প্রতি মাসে একবার নিজেই নিজের স্তন্য পরীক্ষা করুন। অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন আপনার কাছে ধরা পড়লে চিকিত্সক অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে স্তন্য পরীক্ষা করুন। চিকিত্সক যদি কোন চাকা বা পিন্ড অথবা অন্য কোন অস্বাভাবিক পরিবর্তন সনাক্ত করেন তবে পরামর্শ মত ম্যামোগ্রাম, স্তনের আল্ট্রাসনোগ্রাম অথবা অন্যান্য পরীক্ষা করুন। মনে রাখবেন প্রাথমিক অবস্থায় স্তন ক্যান্সার সনাক্ত হলে নিরাময়ের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

 

নিজেই নিজের স্তন্য পরীক্ষা

 

প্রতিমাসে ঋতুবতী মহিলাদের মাসিক শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এ পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ, সে সময়ে স্তন্য কিছুটা হালকা হয়ে থাকে এবং ব্যথা কম হয়। যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে অথবা জরায়ু অপারেশন হয়েছে তারা মাসের যে কোন একটি দিন বেছে নিতে পারেন। মনে রাখার সবিধার্থে যে কোন একটি উল্লেখযোগ্য তারিখ ঠিক করে নিতে পারেন।

 

পরীক্ষা স্থানের সীমানা

 

স্তন্য টিস্যুর ওপরের দিকের কণ্ঠহাড হতে নীচে ব্রা লাইন এবং বুকের মধ্যভাগ হতে বগলের নিচ পর্যন্ত। প্রতি মাসে নিজে পরীক্ষা করার সময় এই পুরো এলাকাই ভালোভাবে লক্ষ্য করতে হবে।

 

প্রথমত:

  1. আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পর্যাপ্ত আলোর মাঝে দু’বাহু দেহের দু’পাশে ঝুলিয়ে দাঁড়াতে হবে।

  2. দু’বাহু মাথার উপরে বা পেছনে উচিয়ে ধরতে হবে।

  3. দু’হাত কোমরে চেপে দাঁড়াতে হবে।

  4. হালকা করে স্তন্যের বৃন্ত চেপে দেখতে হবে, কোন রস বের হয় কিনা।

 

লক্ষ্য করার বিষয়

 

  1. স্তন্যের আকার, আকৃতি ও রং এর পরিবর্তন আছে কিনা।

  2. স্তন্যের ত্বকের কোন পরিবর্তন (পুরু বা পাকা কমলার খোসার মত) আছে কিনা।

  3. স্তন্যের বোঁটা ভিতরের দিকে ডেবে গেছে কিনা।

  4. স্তন্যের বোঁটা দিয়ে নিঃসৃত রসের রং কি এবং রক্ত বের হয় কিনা।

 

দ্বিতীয়ত:স্পর্শ করে অনুভব করুন

 

দুই অবস্থানে (বিছানায় শুয়ে এবং গোসলের সময়) এ পরীক্ষাটি দুই বার করতে হবে। বিছানায় শুয়ে ডান স্তন্য পরীক্ষা করার সময় ডান কাঁধের নিচে ছোট বালিশ বা তোয়ালে ভাঁজ করে দিতে হবে যাতে বৃক ও স্তন্য মোটামুটি একই সমান্তরালে থাকে। তেমনিভাবে বাম স্তন্য পরীক্ষার সময়ও কাঁধের নিচে বালিশ বা তোয়ালে ব্যবহার করতে হবে। আবার গোসলের সময় হাতে সাবান মেখে পরীক্ষা করতে হবে। ডান স্তন্য পরীক্ষা করার সময়ে ডান হাত মাথার উপর রেখে বাম হাত ব্যবহার করতে হবে এবং বাম স্তন্যের জন্য বাম হাত মাথার উপরে রেখে ডান হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কোন অসঙ্গতি থাকলে তা আঙ্গুলের স্পর্শে সহজেই অনুভূত হয়। প্রথমে একটু হালকা চাপ, পরবর্তীতে আরও একটু ভারী চাপ এবং তৃতীয় পর্যায়ে বেশ জোরে চাপ দিয়ে স্তন  টিস্যু সম্বলিত পুরো এলাকা পরীক্ষা করতে হবে। স্তন টিস্যুতে চাপ রাখা আঙ্গুলের প্যাড (ঘুরন্ত লাটিমের মত) একটি অক্ষের উপর কয়েকবার করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনুভব করুন। সব ক্যান্সারই টিউমার, সব টিউমার ক্যান্সার নয়. স্তন্যে পিন্ড বা চাকা হলে যেমন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি সব চাকাই যে ক্যান্সার, তাও কিন্তু নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা  গেছে যে, স্তন্যের চাকার ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ শেষ পর্যন্ত ক্যান্সার হিসাবে চিহ্নিত হয়, বাকি ৯০ ভাগই বিনাইন টিউমার বা অন্য কোন সাধারণ রোগ যা সহজেই নিরাময় করা সম্ভব। সুতরাং সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের ধরণ জানা অত্যন্ত জরুরী।

Posted on 2017-06-11 0 1736

Leave a CommentLeave a Reply

You must be logged in to post a comment.

Blog archives

Blog categories

Latest Comments

No comments

Blog search

Recently Viewed

No products

Menu

Compare 0